Sponsored

ধোকা পর্ব ০২ লেখক: The Story Haven

 ধোকা

পর্ব ০২

লেখক: The Story Haven


​ভেতর থেকে ভেসে আসা হাসির শব্দটা আমার চেনা, কিন্তু সেই হাসির পেছনের ক্রুরতাটুকু ছিল একদম অচেনা। আমি জানালার পর্দাটা সামান্য সরিয়ে ভেতরে তাকালাম। আমার সারা শরীর থরথর করে কাঁপছে।


​ড্রয়িং রুমের রাজকীয় সোফায় আরিয়ান বসে আছে। তার ঠিক পাশেই বসে আছে মেরুন রঙের জমকালো লেহেঙ্গা পরা এক নারী—বয়সে সে আরিয়ানের চেয়ে অন্তত চার-পাঁচ বছরের বড় হবে। তার চেহারায় আভিজাত্য থাকলেও এক ধরনের অহংকার স্পষ্ট। আরিয়ান খুব যত্ন করে তার হাতে জুসের গ্লাসটা তুলে দিচ্ছে।

​সেই নারীর পাশে বসে আছেন একজন বয়স্ক ভদ্রলোক, পরনে দামী শার্ট আর চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা। তাকে আমি চিনি। তিনি বাংলাদেশের অন্যতম বড় আবাসন শিল্প গ্রুপের কর্ণধার, জনাব আসাদুল্লাহ। ড্রয়িং রুমের টেবিলে রাখা ফাইলপত্রের ওপর বড় বড় অক্ষরে লেখা তাদের কোম্পানির নাম।

​আমার শাশুড়ি জাহানারা বেগম আসাদুল্লাহ সাহেবের দিকে ঝুঁকে গদগদ হয়ে বলছেন, "ভাই সাহেব, আরিয়ান তো রাজীই ছিল না। আমিই ওকে বুঝিয়েছি। ডি*ভোর্সি হলে কী হয়েছে? মেহজাবিন মা তো পড়াশোনা উচ্চশিক্ষিত, তার ওপর আপনার মতো বাবার একমাত্র মেয়ে। আমার ছেলের ভাগ্য যে এমন একটা বড় কোম্পানির দায়িত্ব ও পেতে যাচ্ছে।"

​আসাদুল্লাহ সাহেব গম্ভীর গলায় বললেন, "দেখুন জাহানারা বেগম, আমার মেয়ে মেহজাবিনের প্রথম বিয়েটা টেকেনি ওর জেদি স্বভাবের জন্য। ওকে সামলানোর মতো ধৈর্য আর যোগ্যতা আরিয়ানের আছে বলেই আমি এই প্রস্তাবে রাজী হয়েছি। আরিয়ান আমাদের গ্রুপের ডিরেক্টর হিসেবে জয়েন করবে ঠিকই, কিন্তু শর্ত একটাই—আগের স্ত্রীর সাথে সব সম্পর্ক কালকের মধ্যেই চুকিয়ে ফেলতে হবে। কোনো ঝামেলা আমি পছন্দ করি না।"

​আরিয়ান মেহজাবিনের হাত আলতো করে চেপে ধরে বলল, "আঙ্কেল, আপনি একদম চিন্তা করবেন না। ওকে তো আমি ২০ লক্ষ টাকা দিয়ে ইউরোপের টিকিট ধরিয়ে দিয়েছি। ও ভাবছে আমি ওর স্বাস্থ্যের কথা ভেবে স্যাক্রিফাইস করছি। ও ওখানে পৌঁছানোর আগেই ডিভো*র্স পেপার ওর ইমেইলে চলে যাবে। টাকার লোভে সে তো আর ফেরত আসবে না, ওখানেই থাকার চেষ্টা করবে।"

​জাহানারা বেগম হো হো করে হেসে উঠলেন। "আসলে টাকা দিয়ে মুখ বন্ধ করা যায় না এমন মানুষ দুনিয়ায় কমই আছে। ২০ লক্ষ টাকা ওর মতো মধ্যবিত্ত মেয়ের কাছে অনেক। ওটা দিয়ে আমরা ওকে একরকম কিনেই বিদায় করেছি।"

​কথাগুলো আমার কানে বি*ষের মতো বিঁধছিল। মেহজাবিন—যিনি একজন ডিভো*র্সি এবং যার বিশাল সম্পত্তির উত্তরাধিকার আছে—তাকে পাওয়ার জন্য আরিয়ান আর তার মা আমাকে জ্যান্ত কব*র দেওয়ার পরিকল্পনা করেছে। পাঁচ বছরের সংসার, ভালোবাসা, বিশ্বাস—সবকিছু তুচ্ছ হয়ে গেল আরিয়ানের কাছে ওই কোম্পানির ডিরেক্টর পদের মোহে?

​আমি বুঝতে পারলাম, শাশুড়ির ওই নরম সুর, মাথায় ওড়না ঠিক করে দেওয়া, আদুরে 'মা' ডাক—সবই ছিল একটা সুনিপুণ অভিনয়। আমাকে বাড়ি থেকে বের করার জন্য ওটা ছিল একটা সস্তা নাটক।

​মেহজাবিন এবার একটু কর্কশ গলায় বলল, "আরিয়ান, বাসাটা কিন্তু অনেক পুরোনো। বিয়ের পর আমি এখানে থাকব না। বনানীর ওই পেন্টহাউসটা আমার নামে আছে, আমরা ওখানেই শিফট করব। আর তোমার ওই এক্স-ওয়াইফ যেন কোনোদিন আমার সামনে না আসে।"

​আরিয়ান তড়িৎ উত্তর দিল, "একদম না মেহজাবিন! ও তো এখন অতীত। কাল থেকেই আমার নতুন জীবন শুরু, তোমার সাথে।"

​আমি আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারলাম না। মাথাটা বনবন করে ঘুরছিল। যে ২০ লক্ষ টাকা আমার ব্যাগে আছে, ওটা আসলে আমাকে ভালোবাসার উপহার নয়, বরং আমার আ'ত্মসম্মান কিনে নেওয়ার মূল্য। আমি ওখান থেকে সরে এলাম। সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে আমার চোখের জল শুকিয়ে পাথরের মতো হয়ে গেল।

​তারা ভেবেছে আমি হেরে গেছি। তারা ভেবেছে টাকার লোভে আমি পরবাসে পড়ে থাকব। কিন্তু জাহানারা বেগম আর আরিয়ান জানে না—এই ২০ লক্ষ টাকা এখন তাদের পাপের সাম্রাজ্য ধ্বংস করার প্রথম হাতিয়ার হবে।

​আমি গেট দিয়ে বের হয়ে আসলাম। রিকশায় উঠে ফোনটা হাতে নিলাম। আমার কললিস্টে থাকা একজন সাংবাদিক বন্ধুর নাম খুঁজলাম। আজ রাতটা আমার জন্য দীর্ঘ হতে পারে, কিন্তু কালকের সূর্যোদয় আরিয়ান আর তার লোভী মায়ের জন্য অন্ধকার নিয়ে আসবে।

​চলবে...


খুব শীঘ্রই তৃতীয় পর্ব পড়তে চাইলে পেজটি ফলো করে ছোট একটা কমেন্ট করবেন তাহলে তৃতীয় পর্ব পোস্ট করার সাথে সাথে নোটিফিকেশন পেয়ে যাবেন।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ