ধোকা
তানিয়ার বনানীর ফ্ল্যাটে বসে আমি যখন জানালার বাইরে রাতের ঢাকা শহর দেখছিলাম, তখন এক অদ্ভুত শান্তি অনুভব করছিলাম। ৫ বছরের এক মায়াজাল ছিঁড়ে বের হওয়া সহজ ছিল না, কিন্তু সেই জালের আড়ালে লুকিয়ে থাকা পচন দেখে ঘৃণায় মনটা শক্ত হয়ে গেছে।
তানিয়া কফি কাপ হাতে পাশে এসে বসল। "আরিয়ান আর তার মায়ের বিরুদ্ধে মাম*লাটা শক্ত হয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় ভিডিওটা ভাইরাল হওয়ার পর আসাদুল্লাহ সাহেবও তড়িঘড়ি করে প্রেস রিলিজ দিয়েছেন যে তারা আরিয়ানের প্রতার*ণার কথা জানতেন না। নিজেদের দায় ঝেড়ে ফেলতে তারা এখন আরিয়ানের বিরুদ্ধেই সাক্ষী দেবে।"
আমি একটা লম্বা শ্বাস নিলাম। "আরিয়ান কি গ্রেফতার হয়েছে?"
তানিয়া মাথা নাড়ল। "না, পুলিশ সোনারগাঁও হোটেল থেকে ওকে নিতে চেয়েছিল, কিন্তু ওর মা এক প্রভাবশালী উকিল আর কিছু তদ্বির করে আপাতত থানায় নিয়ে গেছেন। হয়তো জামিনের চেষ্টা করবেন। কিন্তু আসল খবর সেটা নয়।" তানিয়া ল্যাপটপটা আমার দিকে এগিয়ে দিল। "জাহানারা বেগম আজ রাতে তোর নামে উল্টো একটা জিডি করেছেন। দাবি করেছেন—তুই ২০ লক্ষ টাকা আর আলমারির কিছু গয়না নিয়ে পালিয়েছিস এবং ওদের ফাঁসাতে ফেক ভিডিও বানিয়েছিস।"
আমি হাসলাম। "অভাবনীয় কিছু নয়। তিনি যে কত বড় মিথ্যুক হতে পারেন, সেটা তো আগেই দেখেছি। কিন্তু তানিয়া, তিনি ফোনের ওপাশে কার সাথে কথা বলছিলেন সেটা কি জানতে পেরেছ?"
তানিয়া গম্ভীর হয়ে গেল। "সেটাই দুশ্চিন্তার বিষয়। তিনি কথা বলছিলেন ওনার বড় ভাই, অর্থাৎ আরিয়ানের বড় মামা লতিফ সাহেবের সাথে। তিনি একজন রিটায়ার্ড সরকারি কর্মকর্তা হলেও তার রাজনৈতিক প্রভাব এখনো বেশ প্রবল। তিনি ধানমন্ডির সেই বাসার অর্ধেকটা নিজের দখলে রাখতে চান আর আরিয়ানকে এই ঝামেলা থেকে বের করার জন্য পেশীশক্তি ব্যবহারের হু*মকি দিয়েছেন।"
রাতের নির্জনতা ভেঙে হঠাৎ আমার ফোনে একটা অপরিচিত নম্বর থেকে মেসেজ এল।
‘২০ লক্ষ টাকা তো ফেরত দিলি না, খামটা ওখানে ফেলে ড্রামা করেছিস। আসল টাকা আর গয়না তো তোর কাছেই। কালকের মধ্যে ওগুলো নিয়ে বাসায় না এলে তোর বাবা-মাকে পুলিশের হাতে তুলে দেব। তোর বাবার একটা পুরনো দুর্নী*তির ফাইল আমার ড্রয়ারে আছে। ভালো চাস তো ফিরে আয়।’— জাহানারা।
আমার হাত কাঁপতে লাগল। মা-বাবা ঢাকার বাইরে থাকেন। আমার বাবা একজন সৎ শিক্ষক ছিলেন, তার নামে দুর্নীতির ফাইল? এটা স্রেফ ভয় দেখানো, নাকি সত্যিই ওরা কোনো চাল চালছে? আরিয়ানের মামা যে কতটা ভ*য়ংকর হতে পারেন, তার গল্প আমি আগেই শুনেছিলাম।
তানিয়া মেসেজটা দেখে বলল, "তোর বাবা-মাকে এখনই সাবধানে থাকতে বল। এটা ব্ল্যা*কমেইল। ওরা এখন কোণঠাসা হয়ে কামড় দেওয়ার চেষ্টা করছে।"
পরদিন সকাল। আমি আর তানিয়া ঠিক করলাম আমরা সরাসরি ধানমন্ডির সেই বাসায় যাব। তবে একা নয়, তানিয়ার চ্যানেলের ক্যামেরাম্যান আর একজন ল’ইয়ার নিয়ে। জাহানারা বেগমকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ না করলে তিনি থামবেন না।
বাসার গেটের সামনে যেতেই দেখলাম বড় একটা তালা ঝুলছে। দারোয়ানকে জিজ্ঞেস করতেই সে ভয়ে ভয়ে বলল, "আম্মা তো কাল রাতেই জিনিসপত্র গুছিয়ে আরিয়ান সাহেবের মামার বাসায় চলে গেছেন। যাওয়ার আগে বলে গেছেন, এই বাসায় যেন কেউ না ঢোকে।"
তার মানে তারা পালিয়েছে। কিন্তু পালানোর আগে তারা আমার জীবনটা তছনছ করার শেষ চেষ্টা করে গেছে। আমি যখন ল’ইয়ারের সাথে কথা বলছিলাম, তখন আরিয়ানের ফোন এল।
"শোনো," আরিয়ানের কণ্ঠস্বর এবার একদম ভিন্ন। কোনো ভয় নেই, বরং এক ধরনের হিং*স্রতা। "তুমি ভেবেছ ওই ভিডিও দিয়ে আমাদের শেষ করে দেবে? আসাদুল্লাহ সাহেব আমাদের সাথে সম্পর্ক ছিঁড়েছেন ঠিকই, কিন্তু আমরা আসাদুল্লাহ সাহেবের চেয়েও বড় শক্তির আশ্রয় পেয়েছি। তোমার বাবা এখন আমাদের লোকের জিম্মায় আছেন। যদি চাও তোমার বৃদ্ধ বাবা জেলে না পচুক, তবে তানিয়াকে বলো সব ভিডিও ডিলিট করতে আর মাম*লা তুলে নিতে।"
আমার পৃথিবীটা যেন দুলে উঠল। "আরিয়ান! তোমরা এত নিচে নামতে পারলে? বাবা তো তোমাকে নিজের ছেলের মতো স্নেহ করতেন!"
"স্নেহ দিয়ে পেট ভরে না," আরিয়ান ক্রুর হাসি হাসল। "বাবার মুক্তি চাইলে আজ বিকেলে সোবহানবাগ মোড়ে এসো। একা আসবে। যদি পুলিশ বা মিডিয়া সাথে থাকে, তবে তোমার বাবার জীবন বিপন্ন হবে।"
ফোনটা কেটে গেল। আমি পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইলাম। যে শাশুড়ি আমাকে ২০ লক্ষ টাকা দিয়ে ইউরোপ পাঠাতে চেয়েছিলেন, তিনি এখন আমার বাবার জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলছেন। তানিয়া আমার দিকে তাকিয়ে বলল, "ওরা মরিয়া হয়ে উঠেছে। কিন্তু আমরা পিছু হটব না। আরিয়ানের মামা লতিফ সাহেব নিজেকে যতটা শক্তিশালী ভাবছেন, তার চেয়েও বড় প্রমাণ আমাদের হাতে আছে।"
আমি চোখের পানি মুছে তানিয়ার হাত ধরলাম। "তানিয়া, ওরা আমার সবচেয়ে দুর্বল জায়গায় আ*ঘাত করেছে। কিন্তু আমি দমে যাব না। আজ বিকেলে আরিয়ানের সাথে সামনাসামনি লড়াই হবে। তবে ওরা যেভাবে চাইছে সেভাবে নয়।"
বিকেল ৪টে। সোবহানবাগ মোড়ের কাছে একটা অন্ধকার গলির ভেতর আরিয়ানের গাড়ি দাঁড়িয়ে। আমি ধীর পায়ে সেদিকে এগিয়ে গেলাম। তানিয়া আর পুলিশ একটু দূরে সিভিল পোশাকে আড়ালে ছিল।
গাড়ির গ্লাস নামল। ভেতরে আরিয়ান আর জাহানারা বেগম বসে আছেন। জাহানারা বেগমের চোখে এখন বিজয়ের হাসি।
"কী রে, খুব তো লম্ফঝম্প করছিলি কাল হোটেলে? এখন আসলি কেন? টাকা আর গয়নাগুলো কোথায়?"
আমি খামটা বের করে আরিয়ানের হাতে দিলাম। "টাকা এখানে আছে। বাবাকে ছেড়ে দাও।"
আরিয়ান খামটা চেক করতে করতে বলল, "শুধু টাকায় হবে না। সব এভিডেন্স আর ভিডিও ডিলিট কর আমাদের সামনে।"
আমি মোবাইলটা বের করলাম। ঠিক তখনই আরিয়ানের মামা লতিফ সাহেবের জিপ গাড়িটা এসে থামল আমাদের পাশে। সেখান থেকে নামলেন সাদা পাঞ্জাবি পরা একজন মানুষ, যার চেহারায় আভিজাত্য নয়, বরং শয়*তানি স্পষ্ট।
"ভাগ্নে," লতিফ সাহেব ডাকলেন। "মেয়ের তো অনেক সাহস। একে দিয়ে হবে না, একে সোজা থানায় নিয়ে চল।"
আমি চিৎকার করে বললাম, "আমার বাবা কোথায়? আগে বাবাকে দেখান!"
লতিফ সাহেব একটা ইশারা করলেন। পেছনের গাড়ির দরজা খুলে গেল। দেখলাম বাবা বিধ্বস্ত অবস্থায় বসে আছেন। আমাকে দেখে বাবার চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল।
জাহানারা বেগম এবার গাড়ির দরজা খুলে নামলেন। "শোন মেয়ে, আমরা চাইলে তোকে জ্যান্ত পুঁ*তে ফেলতে পারি। কিন্তু আমরা তো জেন্টেলম্যান। তুই মা*মলা তুলে নিবি আর তানিয়াকে বলবি সব লাইভ টেলিকাস্ট বন্ধ করতে। নাহলে তোর বাবার দুর্নীতির ফাইল আমরা কালই দুদকে জমা দেব।"
আমি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। তারপর পকেট থেকে একটা ছোট রেকর্ডার বের করে দেখালাম।
"আপনারা ভাবছেন আমি একা এসেছি? এই পুরো কথোপকথন এখন তানিয়ার চ্যানেলের মাধ্যমে হাজার হাজার মানুষ লাইভ শুনছে। আর লতিফ সাহেব, আপনি যে বাবার দুর্নীতির ফাইলের কথা বলছেন, সেই ফাইলের আসল নথিপত্র অলরেডি আমার কাছে আছে—যেখানে দেখা যাচ্ছে আপনি নিজেই বাবাকে দিয়ে জোর করে সাইন করিয়েছিলেন। ওই ফাইলটাই এখন আপনার বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় প্রমাণ।"
লতিফ সাহেবের মুখটা মুহূর্তেই কালো হয়ে গেল। আরিয়ান আর জাহানারা বেগম একে অপরের দিকে তাকাতে লাগলেন। খেলাটা এবার সত্যি শেষ হতে চলেছে।
চলবে...
খুব শীঘ্রই ৬ষ্ঠ পর্ব পোস্ট করা হবে সবাই পেজটি ফলো করে ছোট একটা কমেন্ট করবেন তাহলে ৬ষ্ঠ পর্ব পোস্ট করার সাথে সাথে নোটিফিকেশন পেয়ে যাবেন।

0 মন্তব্যসমূহ