ধোকা
পর্দার ওপর তখন জাহানারা বেগমের সেই অট্টহাসি আর আসাদুল্লাহ সাহেবের সাথে করা রফা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। হলের ভেতর উপস্থিত ডজনখানেক সংবাদমাধ্যমের ক্যামেরা তখন সেই স্ক্রিন আর আরিয়ানের ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া মুখের ছবি তুলতে ব্যস্ত।
আসাদুল্লাহ সাহেব রাগে আর অপমা*নে নীল হয়ে মেহজাবিনের হাত ছেড়ে দিলেন। তিনি বুঝতে পারছিলেন, এই ফুটেজ লাইভ বা নিউজে যাওয়া মানে তার দীর্ঘদিনের তৈরি ‘এএস গ্রুপ’-এর শেয়ার বাজারে ধস নামা।
“সব বন্ধ করো! স্টপ দিস ইমিডিয়েটলি!” আসাদুল্লাহ সাহেব চিৎকার করে উঠলেন। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। তানিয়া তার ল্যাপটপ নিয়ে অডিটোরিয়ামের টেকনিক্যাল কন্ট্রোল রুম থেকে বিজয়ীর হাসি হাসছে।
মেহজাবিন আরিয়ানের দিকে ঘুরে দাঁড়ালো। তার গলার স্বর এখন ড্রয়িং রুমের সেই নরম স্বর নয়, বরং অত্যন্ত কর্কশ। “আরিয়ান! তুমি বলেছিলে তোমার স্ত্রী টাকার পাগ*ল ছিল, সে তোমাকে ডিভো*র্স দিয়ে টাকার বিনিময়ে দেশের বাইরে চলে গেছে! তুমি কি আমাকে আর আমার বাবাকে ব্যবহার করে এই কোম্পানির চেয়ারে বসতে চেয়েছিলে?”
আরিয়ান ঘামছিল। সে তোতলাতে তোতলাতে বলল, “মেহজাবিন, শোনো... ও যা বলছে সব মিথ্যা। এই ভিডিও এডিট করা। ও আমাকে ব্ল্যাকমেইল করছে!”
আমি এগিয়ে গিয়ে মঞ্চের ওপর উঠলাম। আরিয়ানের চোখের দিকে তাকিয়ে ধীরস্থিরভাবে বললাম, “ব্ল্যাকমেইল আমি করছি না আরিয়ান, ব্ল্যাকমেইল তো তুমি করেছ আমার পাঁচ বছরের বিশ্বাসকে। এই যে ছড়িয়ে থাকা টাকাগুলো দেখছ? এগুলো তোমার মায়ের দেওয়া সেই ২০ লক্ষ টাকা, যা দিয়ে তিনি ভেবেছিলেন আমার মুখ বন্ধ করবেন।”
জাহানারা বেগম তখন ভিড় ঠেলে সামনে আসার চেষ্টা করছিলেন। তার সেই শান্ত রূপটা এখন উধাও, সেখানে এক রুদ্রমূর্তি। তিনি আমার দিকে আঙুল উঁচিয়ে বললেন, “তুই এই বাড়ির শান্তি নষ্ট করছিস! তুই জানিস না আরিয়ান তোকে ডিভো*র্স দিয়েছে?”
আমি শান্ত গলায় মেহজাবিনের বাবার দিকে তাকালাম। “আসাদুল্লাহ সাহেব, আপনি একজন ঝানু ব্যবসায়ী। আপনি কি সত্যিই এমন একজনের হাতে আপনার ব্যবসার চাবিকাঠি দেবেন, যে নিজের পাঁচ বছরের স্ত্রীকে টাকার বিনিময়ে ‘গু*ম’ করে দেওয়ার পরিকল্পনা করে? আর আরিয়ান, তুমি ডিভো*র্সের কথা বলছো তো? আমার সই ছাড়া ডিভো*র্স হয় না। আর এই ভিডিওর পর কোনো আদালত তোমাকে মুক্তি দেবে না, বরং জালিয়াতির মাম*লায় জেলেই থাকতে হবে।”
আসাদুল্লাহ সাহেব পরিস্থিতি বুজে মেহজাবিনকে টেনে ধরলেন। “মেহজাবিন, চলো এখান থেকে। আমাদের নাম খারাপ হচ্ছে। আর জাহানারা বেগম, আপনাদের সাথে আমাদের সব সম্পর্ক এখানেই শেষ। এই ধোকাবাজের সাথে আমার মেয়ের বিয়ে তো দূরের কথা, কোনোদিন যদি আমাদের অফিসের ধারেকাছে দেখি, তবে পুলিশে দেব।”
“আঙ্কেল, প্লিজ শুনুন!” আরিয়ান আসাদুল্লাহ সাহেবের পা ধরার চেষ্টা করল। কিন্তু মেহজাবিন নিজেই তাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিল। “ধিক্কার জানাই তোমাকে আরিয়ান! আমার টাকার লোভ তোমার থাকলেও, আমার আ*ত্মসম্মান তোমার চেয়ে অনেক বেশি।”
আসাদুল্লাহ সাহেব আর মেহজাবিন তাদের সিকিউরিটি নিয়ে হল থেকে বেরিয়ে গেলেন। প্রেস কনফারেন্স এখন র*ণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। সাংবাদিকরা আরিয়ানকে ঘিরে ধরেছে।
“আরিয়ান সাহেব, আপনার স্ত্রীর প্রতি এই আচরণের কারণ কী?”
“জাহানারা বেগম, আপনি কি সত্যিই নিজের ছেলের দ্বিতীয় বিয়ের জন্য আপনার পুত্রবধূকে ২০ লক্ষ টাকা ঘু*ষ দিয়েছিলেন?”
জাহানারা বেগম কোনোমতে শাড়ির আঁচল দিয়ে মুখ ঢেকে হল থেকে পালানোর চেষ্টা করছিলেন। আমি তার সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম।
“শ্বাশুড়ি আম্মা, আপনি বলেছিলেন না—‘সবাই ভাগ্যবতী হয় না তোমার মতো শাশুড়ি পেয়ে’? আজ আমি বুঝতে পারছি, আমার ভাগ্য আসলেই ভালো ছিল যে সময়মতো আপনার আসল রূপটা দেখতে পেয়েছি।”
জাহানারা বেগম গলার স্বর নামিয়ে বললেন, “তোর খুব জেদ না? দেখবি, এই টাকা দিয়ে তুই কয়দিন চলিস? আমার ছেলের ক্যারিয়ার নষ্ট করলি, তোকে আমি পথে বসাব।”
আমি মুচকি হাসলাম। “পথ কার হবে সেটা সময়ের ওপর ছেড়ে দিন। আপাতত আরিয়ানকে সামলান, কারণ পুলিশের গাড়ি হোটেলের নিচেই দাঁড়িয়ে আছে। তানিয়া অলরেডি জালিয়াতি আর নারী নির্যা*তনের মা*মলা ফাইল করে দিয়েছে।”
আরিয়ানকে যখন হোটেলের গার্ডরা ধরে সরিয়ে নিচ্ছিল, সে তখন করুণ চোখে আমার দিকে তাকাল। সেই চোখে ভালোবাসা ছিল না, ছিল এক চরম পরাজয়ের ভয়।
আমি সোনারগাঁও হোটেলের বড় হলরুম থেকে বেরিয়ে আসলাম। তানিয়া আমার কাঁধে হাত রাখল।
“এখন কোথায় যাবি?”
আমি আকাশের দিকে তাকালাম। আজ আকাশে কোনো মেঘ নেই। “ধানমন্ডির ওই বাসায় আর নয়। তানিয়া, ২০ লক্ষ টাকা তো ওখানেই পড়ে আছে। আমার দরকার আমার আ*ত্মসম্মান, যা আমি আজ ফেরত পেয়েছি। এবার একটা নতুন শুরুর পালা।”
কিন্তু আমি জানতাম না, জাহানারা বেগম এত সহজে দমে যাওয়ার পাত্রী নন। তিনি তখন ফোনের ওপাশে অন্য কারো সাথে কথা বলছিলেন—কারো সাথে, যে আমার জন্য আরও বড় কোনো বিপদ নিয়ে আসছে
চলবে...
খুব শীঘ্রই ৫ম পর্ব পোস্ট করা হবে সবাই পেজটি ফলো করে ছোট একটা কমেন্ট করবেন তাহলে ৫ম পর্ব পোস্ট করার সাথে সাথে নোটিফিকেশন পেয়ে যাবেন।

0 মন্তব্যসমূহ