Sponsored

ধোকা ​পর্ব ০৩ লেখক: The Story Haven

 ধোকা

​পর্ব ০৩
লেখক: The Story Haven

​রিকশাটা যখন ধানমন্ডির লেকের ধার দিয়ে যাচ্ছিল, বাইরের ঠান্ডা হাওয়াও আমার ভেতরের দহন কমাতে পারছিল না। আমার ব্যাগের ভেতর রাখা ২০ লক্ষ টাকার বান্ডিলগুলো এখন আমার কাছে কাগজের টুকরো নয়, বরং আরিয়ান আর তার মায়ের দেওয়া চরম অপমা*নের দলিল।
​আমি ফোন বের করে সাংবাদিক বন্ধু তানিয়াকে কল দিলাম। তানিয়া ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজমে বেশ নাম করেছে।
“তানিয়া, আমি বিপদে পড়েছি। একটা বড় নিউজ আছে তোর জন্য, কিন্তু তার আগে আজ রাতটা আমার থাকার একটা নিরাপদ জায়গা চাই।”
​তানিয়া আমার গলার স্বর শুনেই বুঝতে পারল কিছু একটা ওলটপালট হয়েছে। ও আমাকে ওর বনানীর ফ্ল্যাটে আসতে বলল।
​তানিয়ার বাসায় পৌঁছে আমি ওকে সব খুলে বললাম। ড্রয়িং রুমে দাঁড়িয়ে করা ভিডিওটা দেখে তানিয়া কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে রইল। তারপর তীক্ষ্ণ গলায় বলল, “এই আসাদুল্লাহ সাহেবের ‘এএস গ্রুপ’ নিয়ে এমনিতেই অনেক গুঞ্জন আছে। মেহজাবিনের আগের ডিভো*র্সটাও ছিল যৌ*তুক আর ক্ষমতার দাপটের এক নোংরা গল্প। কিন্তু আরিয়ান যে এত নিচ হতে পারে, সেটা ভাবিনি।”
​আমি সোফায় হেলান দিয়ে চোখ বুজলাম। আরিয়ানের ওই শেষ কথাগুলো কানে বাজছে— ‘ও তো এখন অতীত’।
​“তানিয়া,” আমি শান্ত গলায় বললাম, “ওরা ভেবেছে ২০ লক্ষ টাকায় আমাকে বিদেশের মাটিতে নির্বাসিত করবে। আমি এই টাকা ওদের মুখে ছুঁড়ে মা*রতে পারতাম, কিন্তু তাতে শুধু আমার জেদ মিটত, ওদের শাস্তি হতো না। আমি চাই ওরা ওই কোম্পানি, ওই পেন্টহাউস আর ওই আভিজাত্যের স্বপ্ন দেখা অবস্থায় আছাড় খেয়ে পড়ুক।”
​তানিয়া হাসল। “তুই ঠিকই ধরেছিস। আসাদুল্লাহ সাহেবের মতো মানুষরা পাবলিক ইমেজ নিয়ে খুব সচেতন। তার মেয়ে আবার এক বিবাহিত পুরুষের সংসার ভেঙে বিয়ে করছে—এটা জানাজানি হলে তাদের কোম্পানির শেয়ারে ধস নামবে। আর আরিয়ান? তাকে তো আমরা জালিয়াতি আর প্রতার*ণার মাম*লায় ফাঁ*সাতে পারি।”
​পরদিন ভোরেই আমি কাজে নেমে পড়লাম। প্রথম কাজ ছিল আরিয়ানের সেই ‘ডিভো*র্স পেপার’ পাঠানো ঠেকানো নয়, বরং সেটা গ্রহণ করা—তবে আমার শর্তে। আমি জানতাম, আরিয়ান ভাবছে আমি এখন দুবাই বা লন্ডনের ট্রানজিটে আছি।
​সকাল ১০টার দিকে আরিয়ানের ফোন এল। আমি খুব স্বাভাবিকভাবে রিসিভ করলাম।
“তুমি, পৌঁছেছ?” আরিয়ানের গলায় এক অদ্ভুত কৃত্রিম উদ্বেগ।
আমি খুব শান্ত গলায় বললাম, “না আরিয়ান, ফ্লাইটে যান্ত্রিক ত্রুটি ছিল, তাই এয়ারপোর্টের কাছেই একটা হোটেলে আছি। কিন্তু এখানে থাকতে আমার ভালো লাগছে না। আমি ভাবছি ফিরে আসব।”
​ফোনের ওপাশে আরিয়ানের নিঃশ্বাস বন্ধ হওয়ার উপক্রম। ও তোতলাতে শুরু করল, “না না! ফিরে আসবে কেন? শরীর খারাপ করবে। তুমি বরং অন্য ফ্লাইটে চলে যাও। মা তো কাল রাতে তোমার ঘর পরিষ্কার করে তালা দিয়ে দিয়েছেন, এখন ফিরলে তোমারই কষ্ট হবে।”
​ঘর পরিষ্কার করে তালা দেওয়া! তার মানে আমার সব স্মৃতি ওরা গতরাতেই ডাস্টবিনে ফেলেছে।
“ঠিক আছে আরিয়ান, তুমি যখন বলছ তখন আমি রওনা দিচ্ছি। তবে আমার মেইলে একটা অদ্ভুত নোটিফিকেশন এসেছে, কোনো লয়ারের কাছ থেকে। তুমি কি কিছু জানো?”
​আরিয়ান এবার ভয় পেয়ে গেল। “আরে না, ওসব স্প্যাম হবে। তুমি ফোন রাখো, সাবধানে যাও।”
​ফোনটা কেটে আমি তানিয়ার দিকে তাকালাম। তানিয়া তখন গোপন ক্যামেরার ফুটেজ আর আসাদুল্লাহ সাহেবের কোম্পানির কিছু পুরনো নথিপত্র এক করছিল।
​“শোন,” তানিয়া বলল, “আজ বিকেলে আসাদুল্লাহ সাহেব তাদের নতুন প্রজেক্টের একটা প্রেস কনফারেন্স ডেকেছেন। মেহজাবিন আর আরিয়ানও সেখানে থাকবে। আরিয়ানকে বড় ডিরেক্টর হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হবে। এটাই সেরা সময়।”
​আমি আয়নার সামনে দাঁড়ালাম। চোখের নিচের কালশিটে মুছে গাঢ় করে কাজল পরলাম। যে মেয়েটা গতকাল পর্যন্ত অসহায় ছিল, আজ তার জায়গায় এক জেদি নারী দাঁড়িয়ে আছে।
​আমি ব্যাগের টাকাগুলো নিয়ে তানিয়ার সাথে গাড়িতে উঠলাম। প্রেস কনফারেন্সের ভেন্যু ছিল সোনারগাঁও হোটেল।
​বিকেল ৪টে। মঞ্চে আসাদুল্লাহ সাহেব মাইক্রোফোন হাতে দাঁড়িয়ে। পাশে বসা আরিয়ান আর মেহজাবিন—দুজনের মুখেই তৃপ্তির হাসি। জাহানারা বেগম পেছনের সারিতে বসে গর্বিত চোখে নিজের ছেলেকে দেখছেন।
​ঠিক যখন আসাদুল্লাহ সাহেব ঘোষণা করলেন, “আজ থেকে আমার মেয়ে মেহজাবিনের জীবনসঙ্গী আরিয়ান আমাদের গ্রুপের লিড ডিরেক্টর হিসেবে—”
​আমি হলের মাঝখান দিয়ে ধীর পায়ে হাঁটতে শুরু করলাম। আমার হাতে সেই ২০ লক্ষ টাকার খাম। হলের সব ক্যামেরা মুহূর্তেই মঞ্চ ছেড়ে আমার দিকে ঘুরে গেল।
​জাহানারা বেগম আমাকে দেখে সোফা ছেড়ে দাঁড়িয়ে পড়লেন। তার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। আরিয়ান যেন ভূত দেখল।
​আমি মঞ্চের সামনে গিয়ে মাইক্রোফোন ছাড়াই তীক্ষ্ণ গলায় বললাম, “আরিয়ান, ইউরোপের ফ্লাইটে যান্ত্রিক ত্রুটি হয়নি, ত্রুটি ছিল তোমার চরিত্রে। তোমার মা আমাকে ২০ লক্ষ টাকায় কিনতে চেয়েছিলেন, কিন্তু তিনি ভুলে গেছেন—একজন মানুষের আত্মসম্মানের দাম তার কোম্পানির মূলধনের চেয়েও বেশি।”
​পুরো হলজুড়ে পিনপতন নীরবতা। মেহজাবিন তার বাবার হাত খামচে ধরল।
​আমি খামটা আরিয়ানের মুখের ওপর ছুঁড়ে মা*রলাম। টাকাগুলো চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল।
“আপনারা কি এই প্রতার*ককে আপনাদের ডিরেক্টর বানাতে চাইছেন, আসাদুল্লাহ সাহেব?”
​জাহানারা বেগম এবার চিৎকার করে উঠলেন, “গার্ডস! এই পাগ*ল মেয়েটাকে বাইরে বের করো!”
​আমি হাসলাম। “পাগ*ল? শ্বাশুড়ি আম্মা, আপনি কি চান তানিয়া রহমান ওই ভিডিওটা প্লে করুক যেখানে আপনি আসাদুল্লাহ সাহেবের কাছে আমাকে ২০ লক্ষ টাকায় বিক্রি করার ডিল করছিলেন?”
​হলের বড় স্ক্রিনটা হঠাৎ জ্বলে উঠল। তানিয়া ইশারা করতেই সেই ড্রয়িং রুমের নোংরা সত্যটা ভেসে উঠল সবার চোখের সামনে। আরিয়ানের হাসি, জাহানারা বেগমের ক্রুরতা—সবই এখন লাইভ দেখছে হাজার হাজার মানুষ।
​আরিয়ান মঞ্চের ওপর দাঁড়িয়ে কাঁপতে শুরু করল। মেহজাবিন তখন রাগে নিজের বাবার দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে বলছে, “বাবা! এসব কী হচ্ছে? ও তো বলেছিল ওর বউ ওকে ছেড়ে চলে গেছে!”
​খেলার তো কেবল শুরু। আসাদুল্লাহ সাহেবের ইমেজের বেলুনটা ফুটো হতে আর কয়েক মুহূর্ত বাকি।
চলবে...
আজকেই চতুর্থ পর্ব পড়তে চাইলে পেজটি ফলো করে ছোট একটা কমেন্ট করবেন তাহলে চতুর্থ পর্ব পোস্ট করার সাথে সাথে নোটিফিকেশন পেয়ে যাবেন

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ